20/05/2026
#গ্রন্থ পরিচিতি:
ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমাবিশ্বের নেতৃত্বে বিগত তিনশ বছরে অর্থনীতি নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কখনও পুঁজিবাদ, কখনও সমাজতন্ত্র কিংবা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নামে। সবগুলো মতবাদই মৌলিকভাবে একই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে, মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতা প্রাসঙ্গিক নয়; বরং অর্থনৈতিক বিষয় অর্থনৈতিক আচরণের সূত্র দিয়েই সমাধান করা হবে। পুঁজিবাদ তার সৌধ নির্মাণ করেছিল বল্গাহীন ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মুনাফার অভিপ্রায় ও বাজারব্যবস্থার নীতির উপর। সমাজতন্ত্র সুখ-সমৃদ্ধি খুঁজেছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সামাজিক প্রণোদনা ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে। কল্যাণমূলক পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিশ্র অর্থনীতি। কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য পরিলক্ষিত হলেও মতবাদগুলো মানবজাতির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে ক্রমাগত ব্যর্থ হয়েছে।
৯০ এর দশকে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে স্বভাবতই প্রশ্ন তৈরি হয়, এটি কি পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদি অর্থনীতির বিজয়? সমাজতন্ত্র যদি তার নিজস্ব অসংগতি ও অসমতার ভারে ধ্বংস হয়ে থাকে তাহলে পুঁজিবাদ কি তার ঐতিহাসিক অসংগতি, অবিচার ও ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? আবার পুঁজিবাদের কতিপয় নির্দিষ্ট ব্যর্থতার জন্য আংশিকভাবে হলেও যদি সমাজতন্ত্রের উত্থান ঘটে থাকে তাহলে তা-ই-বা ব্যর্থ হলো কেন?
এই সকল প্রশ্নেরই জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে ড. উমর চাপরা রচিত Islam and Economic Challange বা “ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ” বইটিতে। এতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যথার্থ উত্তর খুঁজে পেতে পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও অনুসন্ধান চালাতে হবে। যদি কেউ অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে আন্তরিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে সেসব মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যকে পরীক্ষা করে দেখেন, যারা ইসলামী আদর্শের আলোকে এ যুগের অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিয়েছেন, তাহলে মানবজাতির সামনে এক বৈপ্লবিক সুযোগ উন্মোচিত হতে পারে।
বইটিতে লেখক পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত নানাবিধ অসঙ্গতি আলোচনার পাশাপাশি কল্যান রাষ্ট্র, উন্নয়ন অর্থনীতি ইত্যাদি প্রপঞ্চসমূহের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছেন। এরপর ইসলামী বিশ্বদর্শন ও কর্মকৌশলের আলোকে মানব সম্পদের উজ্জীবন ও উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্গঠন, সম্পদের বিকেন্দ্রীকারণ, কৌশলগত নীতি প্রণয়ন ইত্যাদির উপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
ড. চাপরা পেশাজীবী অর্থনীতিবিদ। লেখাপড়া করেছেন করাচী ও মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস ও সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ, পাকিস্তান এর মতো বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন, প্লাটভাইল ও কেনটাকি, লেক্সিনটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সৌদি অ্যারাবিয়ান মনিটারি এজেন্সির সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন ২৬ বছর। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতারই ফসল এই Islam and Economic Challange বইটি।
বইটিতে নিখাদ অর্থনীতির বিদ্যা দিয়ে পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর সাথে যদি ইসলামের অর্থনীতির শ্বাসত নীতিমালা কুরআন-সুন্নাহকেও যুক্ত করা যেতো, তাহলে তা আরও উপকারী হতো।
বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউজ লিমিটেড। অনুবাদ সাবলীল ও মানসম্মত হয়নি বলে অনেক বিজ্ঞ পাঠকের মত। তবু বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য বইটি থেকে উপকৃত হতে পারেন। পাশাপাশি এর মানসম্মত সাবলীল অনুবাদ প্রকাশিত হোক, আমরা প্রত্যাশা করি।