27/05/2026
প্রতি বছর কুরবানির ঈদ এলেই পশুর হাটে লাখ টাকার, এমনকি অর্ধ কোটি টাকার বংশীয় গরুর খবর আমাদের নজর কাড়ে। ২০ লাখ, ৩০ লাখ বা তার চেয়েও বেশি দামে কুরবানির পশু কেনা এখন আর খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এত বিশাল অঙ্কের টাকায় কুরবানির গরু কিনলে কি আলাদা করে কোনো আয়কর দিতে হয় কি?
সহজ উত্তর হলো, গরু কেনার ওপর সরাসরি কোনো স্পেসিফিক ‘আয়কর’ নেই। কিন্তু আয়কর আইনের আসল খেলাটা শুরু হয় অন্য জায়গায়— আপনার আয়ের উৎস এবং আয়কর রিটার্নে। চলুন বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করা যাক।
আপনি ২০ লাখ টাকায় একটি গরু কিনলেন, এর মানে হলো আপনার ব্যক্তিগত বা উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয় অনেক বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বাভাবিকভাবেই আপনার কাছে জানতে চাইতে পারে— এই ২০ লাখ টাকা আপনি কোথায় পেলেন?
আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় নির্দিষ্ট শর্তে করদাতাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবরণী বা আইটি-১০বিবি (IT-10BB) ফরম জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আপনি যখন ২০ লাখ টাকার গরু কিনবেন, তখন উৎসব বা ব্যক্তিগত খরচের খাতে এই টাকা আপনার ফাইলে প্রতিফলিত হতে হবে। আপনার রিটার্নে যদি এই পরিমাণ টাকা খরচ করার মতো পর্যাপ্ত বৈধ আয় বা সঞ্চয় দেখানো না থাকে, তবে আপনি কর বিভাগের নজরে পড়বেন।
ধরা যাক, আপনার আয়কর ফাইলে বাৎসরিক আয় দেখানো আছে ৫ লাখ টাকা বা আপনার তেমন কোনো দৃশ্যমান জমানো টাকা নেই। অথচ আপনি কুরবানির গরু কিনলেন ২০ লাখ টাকার।
এক্ষেত্রে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী, আয়কর কর্তৃপক্ষ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের টাকাকে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ (Undisclosed Income) বা ব্যাখ্যাহীন ব্যয় হিসেবে গণ্য করবে।
এর পরিণতি কী?
এই টাকার ওপর আপনাকে সাধারণ হারে আয়কর দিতে হবে এবং একইসাথে কর ফাঁকির দায়ে জরিমানাও গুনতে হতে পারে।
অনেকে বলতে পারেন, আমি নিজে কিনিনি, আমার প্রবাসী ভাই বা আত্মীয় উপহারের টাকা পাঠিয়েছেন।
সেক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার প্রমাণ এবং যিনি টাকা দিয়েছেন, তার আয়ের বৈধ উৎস আপনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে হতে পারে। নগদ টাকায় এমন দাবি খুব একটা ধোপে টেকে না।
এখন আপনি যদি গরু কেনার খরচই না দেখান?
এটাই হয় বেশি। করদাতাদের পারিবারিক খরচ এই মূল্যস্ফীতির যুগেও সচরাচর ২-৩ লাখের বেশি হয় না।
অডিট হলে কিন্তু পারিবারিক ব্যয় নতুন করে প্রাক্কলন করা হয়। তদন্তে গেলে আমরা এই বিষয়গুলো যাচাই করার চেষ্টা করি এবং তদন্ত প্রতিবেদনে তা উল্লেখও করি।
ধরেন অডিটে আপনার আয়ের নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেল না, কিন্তু আপনার ব্যয় হিসাব করে দেখা গেল আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি। তাহলে বেশি ব্যয়টুকু আপনার আয় হিসেবেই গণ্য হবে।
২০ লাখ টাকার কুরবানির গরু কিনলেই যে সাথে সাথে গরুর হাটে আয়কর দিয়ে আসতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। তবে আপনার আয়কর নথিতে যদি এই বিশাল পরিমাণ ব্যয়ের বিপরীতে বৈধ ও কর পরিশোধিত আয়ের উৎস দেখানো না থাকে, তবে উৎসবের এই আনন্দ পরবর্তীতে আয়কর নোটিশের কারণ হতে পারে।
তাই শখ করে দামি গরু কেনার আগে নিজের আয়কর ফাইলের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সুতরাং, গরু-ছাগল কিনুন; সামর্থ্য থাকলে উটও কিনুন। কিন্তু আয়কর ফাইলের হিসাবটাও একটু মাথায় রাখুন।