11/11/2025
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক জারিকৃত "মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫" সংক্ষেপে চোখ বুলিয়ে নিন।
বিধিমালাটি শেয়ারবাজারে 'মার্জিন লোন' (Margin Loan) নেওয়ার নিয়মকানুনকে আরও কঠোর এবং সুশৃঙ্খল করেছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো পুঁজিবাজারের ঝুঁকি কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা।
মার্জিন লোন কী?
ধরুন, আপনার ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্টে আপনার নিজের টাকা আছে ১,০০,০০০ টাকা। আপনি আরও শেয়ার কিনতে চান, কিন্তু আপনার কাছে আর টাকা নেই।
তখন আপনার ব্রোকার বা মার্চেন্ট ব্যাংক আপনাকে শেয়ার কেনার জন্য অতিরিক্ত কিছু টাকা লোন বা 'অর্থায়ন' দিল, ধরুন ৫০,০০০ টাকা।
এই যে অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা আপনি লোন পেলেন, একেই 'মার্জিন অর্থায়ন' বা মার্জিন লোন বলে। এখন আপনি মোট ১,৫০,০০০ টাকার শেয়ার কিনতে পারবেন।
নতুন বিধিমালার প্রধান বিষয়গুলো কী?
এই নতুন নিয়মমালায় মার্জিন লোন নেওয়া এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন শর্ত যোগ করা হয়েছে।
১. সবাই মার্জিন লোন পাবেন না
-ন্যূনতম বিনিয়োগ লাগবে: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মার্জিন লোন পেতে হলে একজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ৫ লক্ষ টাকা বা সমমূল্যের মার্জিন (টাকা বা শেয়ার) থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, পুঁজিবাজারে তার গত ১ বছরের গড় বিনিয়োগও ন্যূনতম ৫ লক্ষ টাকা হতে হবে।
-কারা লোন পাবেন না: ছাত্র-ছাত্রী, গৃহিণী বা অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মার্জিন লোন দেওয়া যাবে না।
-ব্যতিক্রম: তবে, কোনো গৃহিণী বা অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি 'উচ্চ সম্পদশালী' (High Net-Worth Individual) হন, তবে প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব নীতিমালার ভিত্তিতে তাদের লোন দিতে পারবে।
-প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা: কোনো ব্রোকারেজ হাউসের পরিচালক বা কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা (স্বামী/স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান) সেই প্রতিষ্ঠান থেকে মার্জিন লোন নিতে পারবেন না।
২. লোনের পরিমাণে সীমাবদ্ধতা (কত টাকা লোন পাবেন?)
-সাধারণ নিয়ম: গ্রাহকের পোর্টফোলিও মূল্য ১০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি হলে, গ্রাহক তার নিজের টাকার (ইক্যুইটি) সমান পর্যন্ত লোন পেতে পারেন, অর্থাৎ সর্বোচ্চ অনুপাত হবে ১:১। (উদাহরণ: আপনার ১০ লক্ষ টাকা থাকলে, আপনি সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা লোন পাবেন)।
-ছোট পোর্টফোলিওর জন্য: পোর্টফোলিও মূল্য ৫ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার কম হলে, অনুপাত হবে ১:০.৫। (উদাহরণ: আপনার ৫ লক্ষ টাকা থাকলে, আপনি সর্বোচ্চ ২.৫ লক্ষ টাকা লোন পাবেন)।
-ঝুঁকিপূর্ণ বাজারের জন্য: যদি কোনো কারণে পুরো শেয়ার বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত (Market P/E) ২০ এর বেশি হয়ে যায়, তখন ঝুঁকি কমাতে লোনের অনুপাত কমিয়ে ১:০.৫ করা হবে। (উদাহরণ: তখন ১০ লক্ষ টাকা থাকলেও আপনি সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ লোন পাবেন)।
৩. সব শেয়ারে মার্জিন লোন পাওয়া যাবে না
এই লোনের টাকা দিয়ে আপনি সব ধরনের শেয়ার কিনতে পারবেন না।
-যেগুলো কেনা যাবে: শুধু স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে থাকা 'A' এবং 'B' ক্যাটাগরির শেয়ার কেনা যাবে।
-যেগুলো কেনা যাবে না: 'N', 'Z', বা 'G' ক্যাটাগরির শেয়ার কেনা যাবে না।
-SME, ATB বা OTC প্ল্যাটফর্মের কোনো সিকিউরিটি কেনা যাবে না।
-IPO (পাবলিক অফার) বা রাইট শেয়ারে আবেদন করার জন্য মার্জিন লোন ব্যবহার করা যাবে না।
-যেসব কোম্পানির শেয়ারের P/E অনুপাত ৩০ এর বেশি, সেগুলোতে লোন পাওয়া যাবে না।
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: 'মার্জিন কল' এবং 'ফোর্সড সেল'-এর নিয়ম: এটি হলো ঝুঁকির জায়গা। লোন নেওয়ার পর আপনার কেনা শেয়ারের দাম যদি কমে যায়, তখন ব্রোকার আপনাকে 'মার্জিন কল' করবে।
সহজ উদাহরণ: ধরুন, আপনার নিজের টাকা ১০ লক্ষ এবং আপনি লোন নিয়েছেন ১০ লক্ষ। মোট পোর্টফোলিও মূল্য ২০ লক্ষ টাকা। আপনার লোন ১০ লক্ষ টাকা।
ধাপ ১: মার্জিন কল (সতর্কবার্তা): নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আপনার পোর্টফোলিও মূল্য (Portfolio Value) যদি লোনের ১৭৫% এর নিচে নেমে যায়, তবে ব্রোকার আপনাকে 'মার্জিন কল' করবে।
- হিসাব: ১০ লক্ষ (লোন) x ১৭৫% = ১৭.৫ লক্ষ টাকা।
-
- যদি আপনার পোর্টফোলিওর মূল্য কমে ১৭.৫ লক্ষ টাকার নিচে নেমে যায়, ব্রোকার আপনাকে ই-মেইল বা SMS করে জানাবে। আপনাকে ৩ (তিন) ট্রেডিং দিবসের মধ্যে নতুন করে টাকা জমা দিয়ে বা কিছু শেয়ার বিক্রি করে হিসাব ঠিক করতে হবে।
ধাপ ২: ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রয়): যদি শেয়ারের দাম আরও কমে যায় এবং আপনার পোর্টফোলিও মূল্য লোনের ১৫০% বা তার নিচে নেমে যায়, তখন ব্রোকার আপনাকে কোনো নোটিশ না দিয়েই আপনার শেয়ার বিক্রি করে দেবে ('আবশ্যিকভাবে বিক্রয়' বা Force Sell)।
-হিসাব: ১০ লক্ষ (লোন) x ১৫০% = ১৫ লক্ষ টাকা।
আপনার পোর্টফোলিও ১৫ লক্ষ টাকায় নেমে এলেই ব্রোকার শেয়ার বিক্রি করে তার লোনের টাকা সমন্বয় করে ফেলবে।
এই নতুন বিধিমালা মার্জিন লোন ব্যবস্থাকে অনেক বেশি নিরাপদ করার চেষ্টা করেছে। যারা কম টাকা নিয়ে বা অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করতেন, তাদের জন্য নিয়মগুলো কঠোর করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভালো শেয়ারে, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে লোন নিলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কম থাকবে।