02/06/2026
ডিজিটাল রেমিট্যান্সের অকাল নিধন
আইন অনুযায়ী কর প্রদান করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব—এতে কোনো দ্বিমত নেই। কর রাষ্ট্র পরিচালনার জ্বালানি। তবে কর আদায়ের পদ্ধতি যদি করদাতার টিকে থাকার ওপর আঘাত করে, তবে রাষ্ট্র সাময়িক কিছু রাজস্ব পেলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা দুটোই হারায়
।
বাংলাদেশ যখন বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজছে, তখন ফ্রিল্যান্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন অথবা গুগল অ্যাডসেন্স (AdSense) দেশের তরুণ সমাজের সামনে এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত আয় বাড়াচ্ছে না, বরং সম্পূর্ণ বৈধ পথে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (Foreign Remittance) নিয়ে আসছে।
সম্প্রতি এই খাতের আয়ের ওপর ৭.৫% উৎস কর (Source Tax) বাস্তবায়নে ব্যাংক গুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর আইন কার্যকর করা নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রের অধিকার ও দায়িত্ব, কিন্তু এই কঠোরতা যখন মাঠপর্যায়েরূ রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বা ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ঢালাও উৎস কর আরোপের ক্ষেত্রে মূলত দুটি বড় রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে:
১. শূন্য বিনিয়োগে শতভাগ রিটার্ন:
একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা ফ্রিল্যান্সার সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা এবং পুঁজির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলার আয় করে দেশে আনেন। এই খাতের বিকাশ ও অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। যেখানে রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকি শূন্য, সেখানে টাকা ব্যাংকে আসার সাথে সাথেই যদি বড় অঙ্কের উৎস কর কেটে নেওয়া হয়, তখন করদাতার মনে এক ধরণের ক্ষোভ ও রাষ্ট্রবিমুখতা তৈরি হয়। ফলে অনেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির মতো বিকল্প বা অবৈধ পথে পা বাড়ান।
২. চাণক্যের ‘পক্ব ফল’ নীতি
আড়াই হাজার বছর আগে আচার্য চাণক্য বলেছিলেন—বাগান থেকে শুধু পাকা ফল তোলা উচিত। কাঁচা বা অপক্ব ফল অকালে ছিঁড়লে যেমন মালী মিষ্টি রস পায় না, তেমনি গাছটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশের ডিজিটাল সেক্টর একটি বিকাশমান (Growing) খাত। ক্রিয়েটর বা ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের পেছনে সেটআপ, টিম বা কর্মচারী সহ পেছনে বিশাল ব্যয় থাকে। এই ব্যয়গুলোকে হিসাবভুক্ত না করে ব্যাংক কাউন্টারেই ট্যাক্স কেটে রাখলে তাদের রেমিটেন্স প্রবাহে বাটা পরবে ।
📈 কর আহরণের ‘বৃক্ষ রোপণ’ নীতি (The Investment-Tax Cycle):
বৈধ পথে আসা এই বৈদেশিক মুদ্রা যখন দেশের ভেতরে বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়, তখন অর্থনীতিতে একটি মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট (Multiplier Effect) তৈরি হয়:
স্থাবর বিনিয়োগ: ক্রিয়েটররা যখন এই টাকা দিয়ে দেশে ফ্ল্যাট বা জমি কেনেন, তখন সরকারকে রেজিস্ট্রেশন ফি, গেইন ট্যাক্স এবং স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হয়।
কর্মসংস্থান ও রাজস্ব : এই টাকা দিয়ে যখন তারা নতুন অফিস বা ব্যবসা খোলেন, তখন নতুন কর্মসংস্থান হয়। সেই কর্মচারীরা বেতন পেয়ে বাজারে যখন খরচ করে, সেখান থেকে রাষ্ট্র ভ্যাট রাজস্ব পায়।
ব্যাংকিং তারল্য: এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যখন দেশের ব্যাংকে জমা থাকে, ব্যাংক সেই টাকা অন্য উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিয়ে দেশের শিল্পায়নকে সচল রাখে।
অর্থাৎ, আয়ের প্রবেশদ্বারে বাধা না দিয়ে টাকাটা দেশে ঢুকতে দিলে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ চক্রাকার অর্থনীতি থেকে বহুমাত্রিক কর পায়। কিন্তু শুরুতেই উৎস করের ধাক্কায় সেই টাকা যদি দেশেই না আসে, তবে কর-বৃক্ষ রোপণের আগেই তা শুকিয়ে মরে যায়।
মেধা পাচার ঝুঁকি
দুবাই বা মালয়েশিয়া মতো দেশগুলো ডিজিটাল এন্ট্রাপ্রেনর এবং ফ্রিল্যান্সারদের আকৃষ্ট করতে করমুক্ত সুবিধা এবং গোল্ডেন ভিসা দেয় । বাংলাদেশে ট্যাক্সের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক ও কঠোর হলে দেশের বড় বড় রেমিট্যান্স উপার্জনকারীরা সশরীরে তাদের বিদেশে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।
টেকসই অর্থনৈতিক স্বার্থে করণীয়:
আস্থার পরিবেশ বজায় রাখা : সরকারকে কর আদায়ের চেয়ে করদাতার মনে "আস্থার পরিবেশ" তৈরি করায় বেশি মনোযোগ দেয়া উচিৎ । বৈধ চ্যানেলে বড় রেমিট্যান্স আনয়নকারীদের বিশেষ "ডিজিটাল রেমিট্যান্স বন্ড" বা করমুক্ত পুনঃবিনিয়োগের সুবিধা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।
যৌক্তিক ও সহজ কর পদ্ধতি: করের হার হতে হবে নামমাত্র এবং সহনীয়, যেন তা ক্রিয়েটরের ব্যবসার জন্য বোঝা না হয়। মৌমাছি যেমন ফুলকে আঘাত না করে মধু সংগ্রহ করে, করনীতিও তেমন হওয়া উচিত।
করনীতি কেবল রাজস্ব আহরণের উপায় নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কৌশলগত হাতিয়ার। একটি বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত "আজ সামান্য বেশি কর আদায়" নয়, বরং "আগামী দশ বছরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা"
"অতিরিক্ত দণ্ড বা কঠোরতা প্রজাকে রাষ্ট্রবিমুখ করে তোলে।" আমাদের ডিজিটাল রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যেন ট্যাক্সের ভয়ে দেশান্তরী না হোন বা হুন্ডির আশ্রয় না নেন, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। করের হার যৌক্তিক ও পদ্ধতি সহজ হলে করদাতারা নিজে থেকেই কর দেবেন, দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ হবে।
আপনার মতামত কী?
আমান ঊল্লাহ সরকার
ট্যাক্স কনসালট্যান্ট
চেম্বারঃ
বনানী হাইটস, হাউজ- ১৮, রোড -৮, বক্ল-জি, বনানী, ঢাকা।
ইস্টার্ন আরজু, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ।
হাউজ- ৭, রোড - ৮, সেক্টর -৯, উত্তরা, ঢাকা ।